দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার গণ্ডি থেকে বের করে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার বিকাশে স্কুল-কলেজে শুরু হতে যাচ্ছে ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ প্রতিযোগিতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন ‘এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম’-এর উদ্যোগে আগামী ১২ জুন থেকে মাঠপর্যায়ে দেশব্যাপী এই মেধা অন্বেষণ কার্যক্রম শুরু হবে।
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির খুদে বিজ্ঞানীদের এই প্রতিযোগিতায় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাই শেষে নির্বাচিত সেরা দলগুলো অংশ নেবে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পর্যায়ের মূল পর্বে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে সেরা ১০টি দলকে পুরস্কৃত করবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখা থেকে মঙ্গলবার (২ জুন) সিনিয়র সহকারী সচিব জাবের মো. সোয়াইব স্বাক্ষরিত এক সরকারি পরিপত্রে এই কর্মসূচির নির্দেশনা সংশোধন ও অধিকতর স্পষ্ট করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব উপজেলা এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা মহানগরীর আওতাধীন শিক্ষাতানাগুলোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কলেজ ও মাদরাসা) এতে অংশ নিতে পারবে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির যে কোনো শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতার জন্য যোগ্য। আগামী ১২ জুন দেশব্যাপী সব উপজেলা ও মহানগরীর শিক্ষা থানা পর্যায়ে এবং পরবর্তীতে ১৪ জুন জেলা পর্যায়ে এই শোকেসিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩ জন শিক্ষার্থী ও ২ জন শিক্ষকের সমন্বয়ে এক বা একাধিক দল গঠন করে স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প কিংবা ইনোভেশন আইডিয়া—এই তিনটির যে কোনো ক্যাটাগরিতে নিজেদের প্রজেক্ট প্রদর্শন করতে পারবে।
জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বিচারকদের মূল্যায়নে সেরা ১০টি দল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষ পুরস্কার গ্রহণ করবে। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় আকর্ষণ রাখা হয়েছে অংশগ্রহণকারী সবার জন্য আর্থিক স্বীকৃতিতে। জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থী ‘উদ্ভাবনী মেধাবী শিক্ষার্থী পুরস্কার’ হিসেবে সনদপত্রের পাশাপাশি এককালীন ২০ হাজার টাকা করে পাবে, যা সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। একইভাবে, উপজেলা পর্যায় থেকে নির্বাচিত ও জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়া প্রতি শিক্ষক ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক পুরস্কার’ হিসেবে সনদপত্র ও নগদ ৩০ হাজার টাকা করে পাবেন।
এছাড়া উপজেলা বা থানা পর্যায়ের নির্ধারিত কমিটি প্রথমে প্রদর্শিত প্রজেক্টগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৩টি দলকে পুরস্কৃত করবে। এরপর প্রতি উপজেলা থেকে প্রথম স্থান অধিকারী ১টি দল এবং চার মহানগরীর ২৫টি শিক্ষা থানার প্রতিটির প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ২টি করে দল জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। জেলা পর্যায়ে ১৪ জুনের প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করে পুরস্কৃত করা হবে। জেলা থেকে প্রথম স্থান অধিকারী দল ঢাকার জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে বিশেষ বিবেচনায় রংপুর, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও যশোর জেলা থেকে সেরা ২টি দল এবং ঢাকা মহানগরী থেকে ১৬টি, চট্টগ্রাম থেকে ৫টি, রাজশাহী ও খুলনা মহানগরী থেকে ২টি করে দল সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে যাবে। জেলা কমিটির বাজেট থেকেই ঢাকায় আসার যাতায়াত ভাতা দেওয়া হবে এবং ঢাকার আবাসন ও আনুষঙ্গিক খরচ কেন্দ্রীয় স্কিম বহন করবে। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) স্বাক্ষরসহ বিজয়ী চূড়ান্ত দলগুলোর তথ্য আগামী ১৬ জুনের মধ্যে ই-মেইলে (
[email protected]) পাঠাতে বলা হয়েছে।
এই প্রতিযোগিতার ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের ছোট-বড় সমস্যা সমাধানের উপযোগী টেকসই আইডিয়া তৈরিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ‘স্টার্টআপ’ ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে লাভজনক ও সমাজ-সহায়ক বাণিজ্যিক মডেল তৈরি করবে (যেমন : হাওর অঞ্চলের ধান কাটার ডিভাইস, বই বিনিময়ের অ্যাপ বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা)। ‘বিজ্ঞান প্রকল্প’ বা সায়েন্স প্রজেক্টে থাকবে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্বের হাতে-কলমে প্রমাণ, যেমন কম খরচে পানি শোধন যন্ত্র বা দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা মডেল। আর ‘ইনোভেশন আইডিয়া’র ক্ষেত্রে মানুষের কষ্ট ও শ্রম কমায় এমন যেকোনো সহজ কিন্তু সৃজনশীল ও বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান উপস্থাপন করতে হবে, যেমন পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিকের বিকল্প কিংবা ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা। প্রজেক্ট তৈরির ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল সামগ্রীর চেয়ে বর্জ্য বা হাতের কাছের জিনিস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং উপস্থাপনার জন্য ১-২ মিনিটের মধ্যে বিচারকদের বোঝানোর প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।
কারা থাকছেন কমিটিতে ও কেমন বাজেট?
প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তিন স্তরের কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সদস্য সচিব হিসেবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। জেলা পর্যায়ে সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং সদস্য সচিব থাকবেন জেলা শিক্ষা অফিসার (ডিও)। চার মহানগরীর থানা পর্যায়ে মাউশির আঞ্চলিক উপপরিচালক (কলেজ) সভাপতি এবং থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করবেন। কমিটিতে স্থানীয় সরকারি কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরাসরি জেলা শিক্ষা অফিসারদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। বাজেট বিবরণী অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ের প্রোগ্রামের জন্য ১ লাখ টাকা, মহানগরী থানা পর্যায়ের জন্য ১ লাখ ১৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ের বাজেটে ঢাকার জন্য ২ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা, চট্টগ্রামের জন্য ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, রাজশাহী ও খুলনার জন্য ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য ক্যাটাগরির জেলাগুলোর জন্য আকারভেদে ১ লাখ ৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দ থেকে আপ্যায়ন, দুপুরের খাবার, ভেন্যু ব্যবস্থাপনা, স্টল তৈরি, ট্রফি-ক্রেস্ট এবং যাতায়াত ভাতার ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
আর চূড়ান্ত পর্বে ঢাকার বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মূল অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেলে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের প্রজেক্ট প্রদর্শনী মহড়া অনুষ্ঠিত হবে এবং মূল দিনে প্রধানমন্ত্রী নিজে এসব উদ্ভাবনী প্রজেক্ট পরিদর্শন করবেন বলেও জানানো হয়েছে।
আরএইচটি/এমএন